সোমবার, ১৮ মে ২০২৬

বহুরূপীর 'দীপদণ্ড' - সাম্প্রতিক প্রযোজনায় ব্যতিক্রম

কনক দাশগুপ্ত

নাট্য প্রযোজনার বর্তমান স্তরে যেখানে ভাবনার ওপর ভঙ্গিমার মোড়লিতে ফলাও বাণিজ্যের দাপট, প্রচারযন্ত্রের আনুকূল্যে পাদপ্রদীপের নিম্নপ্রান্তে জবরদখলি, ঝকমারি তাক লাগানো তাজ্জবের মাত্রাধিক্যে নাট্যবোধের স্বীকৃতি আদায়ের প্রতিযোগিতা, সেখানে যথার্থ নাট্যরসিকের অনুসন্ধানী মন খুঁজে ফেরে সুস্থ সচেতন চিন্তাজাত বিষয়ের উপযুক্ত নাট্যরস সিঞ্চনে দর্শক মনকে নাড়া দেবার প্রয়াস। বিকৃতি, বিকলাঙ্গতায় কিংবা সস্তা চটকদারীতে যখন শিল্পজগৎ আচ্ছন্ন, সামাজিক চাহিদার প্রতি যখন শিল্পী-পরিচয়ের দাবিদারদের ঔদাসীন্য প্রকট, মানবতার প্রতি দায়বদ্ধতার ন্যূনতম খেয়ালটুকুও যখন বাহুল্য জ্ঞানে বর্জিত কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক আনুকূল্যলাভের অন্তরায় হিসাবে পরিত্যাজ্য, তখন নাটকের আঙ্গিনায় ভিন্ন প্রবণতা যে সংখ্যাগরিষ্ঠ হবে না তা বলার অপেক্ষা রাখে না। সেজন্যই "দীপদণ্ড' মঞ্চায়নের জন্য বহুরূপী গোষ্ঠী সমীহ আদায় করে নেন। বলা চলে, সাম্প্রতিককালে প্রাসঙ্গিক বিষয়বস্তুকে উচ্চাঙ্গের নাট্যরূপে পরিবেশনের ক্ষেত্রে বহুরূপীর এই প্রয়াস কেবল ব্যতিক্রমীই নয়, বিশিষ্টও। নাটকটিতে দুটি মূল প্রশ্নের অবতারণা করা হয়েছে। প্রথমটি হলো মানুষের বিচার, স্বীকৃতি তার জন্মপরিচয়ে না কর্মস্বাক্ষরে। জন্মসূত্রে মানুষ যাই হোক না কেন, জীবন চিন্তা এবং কর্মপ্রয়াসেই তার মনুষ্যত্বের প্রকাশ। আর একজন চিকিৎসক, বা বৃহত্তর পটভূমিতে একজন পেশাগত দক্ষতার অধিকারী মানুষের নৈতিক চিন্তা, সামাজিক দায়িত্ববোধ কি হওয়া উচিত, কার প্রয়োজনে কোন উদ্দেশ্যে তিনি তাঁর আহরিত জ্ঞান বা কলানৈপুণ্যের প্রয়োগ ঘটাবেন। যথার্থ চিকিৎসাবিদ কি জীবনে প্রতিষ্ঠা মানে বুঝবেন দেদার অর্থ উপার্জন, মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে মুষ্টিমেয় ধনিক কুলের পরিষেবায় আত্মনিয়োগ, তার বিনিময়ে আত্মপ্রতিষ্ঠা, যশ, খ্যাতি, স্বাচ্ছন্দ্য, আয়াস? নাকি তাঁর ব্রত হবে সমাজের সংখ্যাগরিষ্ঠ নির্যাতিত নিপীড়িত দারিদ্র্যে জর্জরিত মানুষকে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়া, সভ্যতার অগ্রগতির পথ বেয়ে আহরিত জ্ঞান, দক্ষতা, সমস্যা নিবারণের ক্ষমতাকে সভ্যতার প্রকৃত বাহকদের যথার্থ প্রয়োজন মেটানোর কাজে নিয়োগ করা? এই টানাপোড়েন দ্বন্দ্বের আবর্তেই 'দীপদণ্ডের' আখ্যান উপস্থাপিত, বিস্তৃত। প্রেক্ষাপট হিসাবে নাট্যকার বেছে নিয়েছেন প্রাচীনকালের এক অধ্যায়, রাজা বিম্বিসারের রাজত্বকাল। তখন বৌদ্ধধর্মের চূড়ান্ত প্রভাব। অভিজাত রাজন্যকূল, সুবিধাভোগী শ্রেষ্ঠী সম্প্রদায়ের হাতেই সমাজের কর্তৃত্ব শাসন করায়ত্ত। সেইসময় মগধের অনতিদূরে এক গুরুর শিক্ষানিকেতনে চলছে আয়ুর্বেদীয় চিকিৎসাশাস্ত্রের পঠন পাঠন, গবেষণা। শল্যচিকিৎসার নানাবিধ পরীক্ষা-নিরীক্ষা। সাতবছরব্যাপী পাঠক্রমের অন্তে শিক্ষার্থী নিজের যোগ্যতার প্রমাণ দিয়ে লাভকরছেন পেশাদার চিকিৎসকের শিরোপা। তেমন দুই সহপাঠী জীবক এবং সুদত্ত। গুরুর অন্যতম দুই শ্রেষ্ঠ ছাত্র। সুদত্তর জন্ম বিত্তবান শ্রেষ্ঠী গৃহে। কিন্তু জীবক জারজ সন্তান। এই সামাজিক কলঙ্ক নিয়েই তাঁর বিদ্যাভ্যাস। কিন্তু আপন ক্ষমতা এবং মেধাবলে সে সমস্ত ছাত্রের মধ্যে অগ্রগণ্য। জীবকের আশ্চর্য প্রতিভায় সুদত্ত মুগ্ধ। তাই প্রথাগত শিক্ষাকাল অতিক্রান্ত হবার পরও সুদত্ত কামনা করে যে সে জীবকের অধীনে আরও তিনবছর শিক্ষানবিশের রূপে তালিম নেবে। এতে গুরুও সায় দেন। জন্মপরিচয়জনিত অবস্থানের দরুণ জীবক প্রথমে দ্বিধাগ্রস্থ থাকলেও সুদত্তর আগ্রহ ও পীড়াপীড়ি এবং গুরুর নির্দেশে সে রাজী হয়ে যায়। সুদত্তর জীবনের উদ্দেশ্য, শল্যচিকিৎসায় পারদর্শী হয়ে সে সুদূর গ্রামাঞ্চলে হত দরিদ্র মানুষদের মাঝে গড়ে তুলবে চিকিৎসালয়, নিয়োজিত হবেন আর্তের সেবায়, তাদের মধ্য থেকে সংগ্রহ করবে স্বাস্থ্যকর্মী, স্বেচ্ছাসেবক। জ্বালবে নূতন আলো। জন্ম পরিচয়ে সুদত্ত মানুষ খোঁজে না, তার মানুষের সন্ধান কর্মের আঙিনায়, মনুষ্যত্বের গভীরতায়। জীবক তার এই সংকল্পকে সাধুবাদ জানায় কিন্তু নিজের লক্ষ্য হিসাবে তা বেছে নিতে তেমন আগ্রহ দেখায় না। অন্যদিকে এক শ্রেষ্ঠীকন্যা সুন্দরী সুদত্তর প্রতি অনুরক্তা, তার বাগদত্তা। সুদত্ত তার অনুরাগের সম্ভার উজাড় করে দিতে উপস্থিত হয় শ্রেষ্ঠীতনয়ার গৃহে। কিন্তু সুদত্তর জীবনউদ্দেশ্য এবং রিক্ত, নিঃস্ব মানুষদের মধ্যে থেকে অতি সাধারণ জীবনযাপন করাকে মেনে নেওয়া বিত্তবান শ্রেষ্ঠী দুহিতার পক্ষে সম্ভব হয় না। এমন জীবনের সঙ্গে নিজেকে বাঁধতে পারার আত্মপ্রত্যয় তার নেই। তাই পাণিগ্রহণের সমস্ত আয়োজন অনুষ্ঠান নির্দিষ্ট হয়ে থাকা সত্ত্বেও সুদত্তর হাতে সে নিজেকে সমর্পণ করতে পারে না। সে মনে করে সুদত্ত আত্মগরিমা প্রচারের জন্য এপথে যেতে চায়। তাই সে কিঞ্চিৎ রূঢ় হয়ে সুদত্তকে প্রত্যাখ্যান করে। জানায়, অন্য এক রাজপুত্র তার পাণিগ্রহণে আগ্রহী। তার এই দ্বন্দ্ব, প্রয়োজনীয় মানসিক দৃঢ়তার অভাব সুদত্ত বোঝে। তাই সে বিদায় নেয়। যাবার সময় বলে যায় যে যদি শ্রেষ্ঠীকন্যা কোনদিন মন পরিবর্তন করে, তার জীবনব্রতকে স্বীকৃতি দিয়ে গ্রহণ করতে চায়, তবে সেদিনের জন্য সে অপেক্ষা করবে। অন্যদিকে সুদত্তর প্রস্থানের পর একান্ত দাসীর কাছে আলাপচারিতায় শ্রেষ্ঠীকন্যা জানায় অন্য রাজপুত্রের আগ্রহের কথাটা মিথ্যা। সুদত্তকে সমস্ত পিছুটান থেকে মুক্ত করার জন্যই তার এই প্রতারণার আশ্রয়। এরপর ঘটনার রাশ এগোয়। সুদত্ত গড়ে তুলেছে তার চিকিৎসার আশ্রম। তাকে ঘিরেই তার সমস্ত জীবন আবর্তিত। চম্পাশহরের বিত্তবান সম্প্রদায়ের আড়ম্বরপূর্ণ জীবনে কোন আগ্রহ নেই তার। অন্যদিকে জীবক স্বয়ং রাজার শরীরে বিরল অস্ত্রপ্রচার করে রাজবৈদ্যের সম্মানলাভ করেছে। দুই বন্ধুর দেখা হলে সুদত্ত তাঁকে দরিদ্রের সেবার পথে আসার অনুরোধ জানায়। কিন্তু জীবকের যুক্তি অন্য। জারজ-সন্তান হিসাবে সে যখন পরিত্যক্ত, আস্তাকুঁড়ে কাকের কামড়ে যখন তাঁর শিশুশরীর ক্ষতবিক্ষত, তখন জনৈক শ্রেষ্ঠী তাকে উদ্ধার করেন। ফলে বৌদ্ধধর্মের প্রতি তিনি কতৃজ্ঞ। আবার জারজ হওয়া সত্ত্বেও পেশাগত কুশলতার জোরে শাসক রাজন্যকূলে প্রতিষ্ঠার আসন আদায় করে নেবার দ্বারা এক সুপ্ত প্রতিহিংসার প্রবৃত্তিও তার মনকে আচ্ছাদিত করে রেখেছে। যদিও পরবর্তী একটি ঘটনায় ইঙ্গিত আছে যে রাজশক্তি তাকে সম্মানের বেদীতে অধিষ্ঠিত করলেও মান্যতার অধিষ্ঠান দেয়নি। সুদত্ত জীবককে অনুরোধ করে একটি সদ্যমৃত কোন দেহ যোগাড় করে দিতে যাতে সে শিক্ষার্থীদের শব ব্যবচ্ছেদ বিষয়ে আরও সুদক্ষ করে তুলতে পারে, শল্য চিকিৎসায় আরও নৈপুণ্য আনতে পারে। কিন্তু ধর্মের প্রাবল্য আর রাজন্যকূলের অসম্মতিতে তা সম্ভব হয় না। জীবক সেখানে অসহায়। পাশাপাশি কয়েকটি খণ্ডিত দৃশ্যে তৎকালীন বৌদ্ধ প্রচারক নৈষ্ঠিকদের চারিত্রিক দুর্বলতা, আদর্শের আলগা ভিত, ধর্মের দোহাই পেড়ে বৈজ্ঞানিক চিন্তা, শল্যচিকিৎসার অভ্রান্ততার বিরোধিতা করা, ভোগলোলুপতার প্রকোপ ইত্যাদিরও ইঙ্গিত আছে। প্রৌঢ়ত্বের প্রান্তসীমায় সুদত্ত তাঁর আশ্রমকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। ইতিমধ্যে শ্রেষ্ঠীকন্যার মনে পরিবর্তন দেখা দিয়েছে। প্রণয় বিবাহে রূপান্তরিত হয়েছে। তবে পতিগৃহেই রয়ে গেছে তার পত্নী। দরিদ্র মানুষের গ্রামে অনাড়ম্বর কঠোর জীবনে সে সামিল হতে পারেনি। আশ্রমের সমস্ত কর্মীরা সুদত্তর আজ্ঞাবহ নিবেদিত প্রাণ। এদের অনেকেই দক্ষতা এবং সুযোগ থাকা সত্ত্বেও সুদত্তর গ্রামীণ চিকিৎসাশ্রম ছেড়ে যশপ্রতিষ্ঠার পথে পা বাড়াতে চায় না। সুদর্শন এক যুবক সর্বদাই সুদত্তর কাছে কাছে থাকে, সর্বতোভাবে তাকে সাহায্য করে। সুদত্ত তাকে আশ্রম ছেড়ে প্রতিষ্ঠার জগতে যাবার কথা বলে। কিন্তু সুদত্তর অনুরোধ পরামর্শকে সবিনয়ে প্রত্যাখান করে আশ্রমেই থেকে যায়। একদিন চম্পাশহর থেকে এক দূত আসে। সঙ্গে একটি চিঠি আর অদূরে রক্ষিত একটি শকট। পত্নীর পত্র। পাঠ করতে করতে সুদত্ত চমকে ওঠে। প্রিয়তমা আর নেই। কিন্তু শকটে রয়েছে তার সদ্যমৃত দেহ, সুদত্তর বহু আকাংখিত চিকিৎসা শিক্ষার উপাদান। মৃত্যুর পূর্বে নিজের দেহদান করে গেছে সে আর জানিয়ে গেছে যে চিকিৎসা আশ্রমের অধিবাসী সুদর্শন যুবকটি তাদেরই গভীর প্রণয়ঘন দাম্পত্যজীবনের নিদর্শন। একমাত্র সন্তান। পিতার আদর্শে নিজেকে অনুপ্রাণিত করে পথ চলার আদেশই সে পেয়েছে তার মাতার কাছ থেকে। কর্মপরিচয়েই মানুষের বিচার, জন্মের ইতিবৃত্ত নয়। ধনীর যশ-অর্থের ঘোরাটোপ নয়, অবহেলিত শোষিতের জীবন আত্মপরিচয়। থেকে বঞ্চনার অভিশাপ মুছে দেওয়াতেই প্রকৃত জ্ঞানীর আত্মপরিচয়। কাহিনীর সার এটিই। নাট্যকার তীর্থঙ্কর চন্দের দৃশ্য এবং সংলাপ রচনার নিঃসন্দেহে মুন্সিয়ানা আছে। নাটকের শুরুতেই পরিচালক জানিয়ে দেন যে নাট্যরূপটি প্রচলিত পথে ঘটনা পরম্পরায় সুগ্রথিত নয়। বরং খণ্ড খণ্ড ঘটনার সন্নিবেশে গড়ে তোলা একটি কাহিনী চুম্বক। বাস্তবিক তাই হলেও গ্রন্থনাটি এত সুন্দর যে কোথাও তাল কাটেনি, নাটকের ধর্ম নষ্ট হয়নি। বরং নানা সময়ের ছোট ছোট ঘটনার সমাহারে একটি ঐতিহাসিক আলেখ্যের রূপাশ্রয়ে বলতে গেলে নিখুঁত। এটি ইতিহাসের অনুবর্ণন বা হুবহু বক্তব্যের আধুনিকীকরণ বা তাকে প্রাসঙ্গিক করে তোলাটা অসারতা, অত্যাচারী শাসকের চরিত্র ইত্যাদির সঙ্গে অনুসরণ নয়। বরং সাম্প্রতিক ঘটনা, সমস্যা, ধর্মীয় চিন্তার মেলাতে গিয়ে অনেক ক্ষেত্রেই নাট্যকার নাট্যরচনার স্বাধীনতা নিয়েছেন এবং কালানুক্রম অনুসরণ করেন নি। এ জায়গাতে নাট্যকার সফল। আবার কাহিনীর মূল অবতারণা করা হয়েছে, সেগুলোও খুবই সুপ্রযুক্ত। যেমন এক বৌদ্ধ ভিক্ষুর দৃশ্য। তিনি ধর্ম আঁকড়ে ঐ নৈষ্ঠিক ব্রতচারিতা আঁকড়ে থাকলে জীবনের অনেক উপভোগ্যতা বাদ থেকে যাবে। ফলে ধর্মের আবেদন আর তার মধ্যে কাজ করে না। সে জীবনকে ভোগ করতে চায়। অনুযায়ী লবণভক্ষণ নিষিদ্ধ হলেও সে কালো তার কাছে পেট আগে, ধর্ম পরে। তাই বৌদ্ধধর্মের বিধান করে, তিরস্কার করে, অথচ তার তোলা কোন প্রশ্নের ডোঙাজাতীয় পাত্রে লবণ নিয়ে ঘোরে। ভিক্ষু প্রতিবাদ করে, তিরস্কার করে, অথচ তার তোলা কোন প্রশ্নের জবাবই সে দিতে পারেনা। তাদের মধ্যকার তর্কবিতর্ক এবং ভোগসর্বস্ব জীবনের প্রতি আকর্ষণকে ধর্মীয় চিন্তাপ্রসূত জোরালো যুক্তি দিয়ে খণ্ডনে অপারগ বৌদ্ধ সন্ন্যাসীকে দেখে অন্য আর এক আশ্রমবাসী যুবক আঁতকে ওঠে। আশ্রম পরিত্যাগ করে ধর্মীয় জীবন ছেড়ে লাঙল চযার নাম করে পুরানো গার্হস্থ্যজীবনে ফিরে যায়। এই দুটি যুবকের দুই ভিন্ন পলায়নধর্মিতা, ধর্মীয় অনুশাসন, নীতি আচারের অসারতার পাশাপাশি সুদত্তর পুত্রের আদর্শনিষ্ঠা মুহূর্তে জায়গা করে নেয়। জ্ঞান তুমি কার জন্য লাগাবে, সমাজের প্রতি তোমার দায়বদ্ধতা কি- এ প্রশ্নে সুদত্তর পুত্রের কোন সংশয় নেই। সে তার পথ খুঁজে পেয়েছে। সমাজের অগ্রগতি, তার উন্নয়নের রাস্তা প্রশস্ত করতেই জ্ঞানের প্রয়োজন। এটাই জ্ঞানীর কর্তব্য। তাই সাধারণ ঘরের সন্তান হয়েও যেখানে পূর্বোক্ত যুবকদ্বয় জানালোক প্রাপ্ত হয়নি, তখন ধনীর ঘরে জন্ম নিলেও জ্ঞানের আলোকপ্রাপ্ত সুদত্ততনয় স্বেচ্ছায় কঠোর জীবন বেছে নিয়ে আর্তের সেবায় আত্মনিয়োগে কুণ্ঠিত হয়নি। ঠিক একইভাবে কন্যাশোকে জর্জরিত জনৈক বৃদ্ধের মুখ দিয়ে কতগুলো সংলাপের মধ্য দিয়ে সাম্প্রতিক অবস্থার সঙ্গে সাদৃশ্য টেনে তীব্র কটাক্ষ আছে। যেমন, বুদ্ধ আজ শ্রেষ্ঠীর করায়ত্ত। সমাজে মাৎস্যন্যায় চলছে। গণরাজ্য অর্থাৎ গণতন্ত্র আজ ধনী বণিকের নিয়ন্ত্রণাধীন। কিন্তু এতসত্ত্বেও জীবকের চরিত্রটিতে কিন্তু একটা অস্বচ্ছতা থেকে গেছে। নাটকের গোড়ার দিকে যখন জীবক-সুদত্তের জীবনদর্শন ব্যক্ত এবং তাকে ঘিরে দ্বন্দ্বের অবতারণা, তখন থেকেই এই দ্বন্দ্ব কোন পথে নিরসন হবে তা নিয়ে একটা কৌতূহলের সৃষ্টি হয়। দেখা গেল, অনেক কথা বলা সত্ত্বেও জীবক বুদ্ধধর্মের প্রবক্তা-প্রচারক রাজার প্রতিনিধি। লাঞ্ছিত বৃদ্ধ তাকে জিজ্ঞেস করলো যে, যুদ্ধে যদি এতই ক্ষয় বিনাশ তাহলে রাজা যুদ্ধ করলেন কেন? জীবক তার উত্তরে হাত তুললেন। শান্তির হাত, দেবতার মূর্তিতে বিধৃত অভয়ের করকমল। তবে কি জীবক রাজন্যকুল শ্রেষ্ঠী সম্প্রদায়কে ব্যবহার করতে গিয়ে নিজেই তাদের দ্বারা ব্যবহৃত হলো? রাষ্ট্রশক্তির কৃপায় শাসনকাঠামোয় বিশিষ্ট পদ জুটিয়ে রাষ্ট্রের বিরোধিতা করার কল্পনা যে অলীক, সেটাই কি জীবকের মধ্য দিয়ে প্রতিপাদ্য হলো? কন্যার মৃত্যুতে শোকাচ্ছন্ন করলো, জীবক তাদের আদেশ করলো যে বৃদ্ধকে যেন বিদ্রোহী বৃদ্ধ পিতাকে যখন রাজপ্রহরীর দল গ্রেপ্তার প্রাণে না মারা হয়। কিন্তু তার আদেশ অমান্য করে রাজভৃত্যের দল বৃদ্ধকে বিনাদ্বিধায় হত্যা করলো। তার মানে কি জীবকের নির্দেশ পালনের কোন বাধ্যতা নেই সৈন্য-কোতোয়ালের? এই সমস্ত বিষয়গুলোকে কেন্দ্র করে ধোঁয়াশা কিন্তু কাটেনি। ফলে জীবকের পরিণতি নিয়ে প্রশ্ন থেকে গেলো। এটিকে বাদ দিলে নাট্যরচনায় অন্যকোন অসঙ্গতি সামনে আসেনি। বরং শেষদৃশ্যের চমকটি খুবই সুন্দর। ধনীর ঘরে জন্ম নেওয়া শ্রেষ্ঠী কন্যা প্রেমিকের প্রতি গভীর অনুরাগ সত্ত্বেও অনিশ্চিত জীবন, বৈভবের অনুপস্থিতিজনিত নিরাপত্তার অভাব ইত্যাদি আশঙ্কায় জর্জরিত হয়ে নানা ঘাত-প্রতিঘাতের ভিতর দিয়ে এগোলেও সুদত্তর মহত্ত্বের প্রতি আকর্ষণ থেকে সার্থক ভালবাসার আবেদন, দায়িত্ব, মহত্ত্বকে শেষ পর্যন্ত গ্রহণ করে নিজের জীবনকে এক বিশাল উত্তরণে মহিমান্বিত করে গেল। সামাজিক প্রয়োজন, কর্তব্যবোধ, উপাদানের সঙ্গে তার চরিত্রের একাত্মতাতেই এই উত্তরণ প্রোজ্জ্বল হয়ে রইলো। আঙ্গিকগত দিক থেকেও নাটকটি খুবই উঁচুমানের। দৃশ্যসজ্জা বলতে গেলে অনাড়ম্বর। যতটুকু প্রয়োজন ততটুকুই। পরিমিত সেটের উপর আলোকসম্পাতও খুবই সুন্দর। আর দৃশ্যনির্মাণ বা কম্পোজিশনও অতি উন্নত। শেষ দৃশ্যে সুদত্তর চিঠি পড়ার সময় পেছনে তার পত্নীর ছায়ামূর্ত্তি আলো আঁধারিতে ফুটে ওঠা ও চিঠির কিছু অংশ তার মুখ দিয়ে বলানোটা খুবই সুন্দর। বোধ করি শ্রেষ্ঠীকন্যার কণ্ঠটি মাইকে না বলিয়ে মঞ্চে লাইভ বলালে ভাল হতো, বিষয়টা আরও স্পষ্ট হতো। তবে চিঠি পড়ার পর সুদত্তর হঠাৎ আর্ত্ত চীৎকার এবং মুহূর্তে মাত্র গোটা তিনচার চরিত্রকে মঞ্চে হাজির করার মধ্য দিয়ে একটা জনসমাবেশ বা Crowd effect সৃষ্টি করাটা অনবদ্য। একইভাবে মঞ্চের মাঝখানে একটা আলোর বৃত্তের চারধারে ঘুরে ঘুরে জীবক ও সুদত্তর বহুদূর পথচলার ইঙ্গিত, শ্রেষ্ঠীকন্যাকে প্রণয় নিবেদনের সময় উঁচু মঞ্চে প্রণয়ী এবং সিঁড়ির দুধাপ তলায় দাঁড়ানো সুদত্তর হাতে হাত রাখা খুবই রূপকধর্মী। একইভাবে মঞ্চের একেবারে সামনে বা প্রসেনিয়ামে, কালোপর্দার সামনে নাটকের অংশবিশেষের অভিনয়টিও গতানুগতিকতায় আটকে না থেকে অন্যমাত্রা পেয়েছে। অভিনয়ও অত্যন্ত উচ্চপর্যায়ের। কোমরে ব্যথা নিয়ে চলা ব্রাহ্মণ পণ্ডিত, কন্যাশোকে কাতর মাতাল বৃদ্ধ, জনৈক জড়িবুটি বিক্রেতা এবং সুদত্তর চরিত্রচিত্রণ বিশেষ উল্লেখের দাবি রাখে। তবে শ্রেষ্ঠীকন্যার চরিত্রটিতে অভিনয়ের অনেকবেশী সুযোগ ছিল। সেই অর্থে অভিনয় মার খেয়েছে। নাটকটি সংলাপ বহুল। সেদিক থেকে নাটকে যাকে অ্যাকশন বলে তা কম। আজকাল তথাকথিত নাট্যবিদগ্ধজনের ধারণা হলো অহেতুক ছোটাছুটি, হৈ হট্টগোল, জগঝম্প, বা আলো মঞ্চের কেরামতি না থাকলে নাটকের গতি ব্যর্থ হয়। কিন্তু নাটকের গতি তো বিষয়ের সঙ্গে সম্পর্কবিযুক্ত বহিঃপ্রযুক্ত কতগুলো অ্যাকশনের নিরিখে নির্ধারিত হয় না। গতি তার বিষয়চয়ন এবং উপযুক্ত নাট্যরসসৃষ্টির মধ্যে। জীবনের গতি, তার চলমানতায় বৈচিত্র্যের সম্ভারকে যদি ঠিকমত ধরতে পেরে নাটকের রূপাশ্রয়ে মঞ্চে তুলে ধরা যায়, তবেই তা গতি পায়। দীপদণ্ডের প্রযোজনায় এটাই প্রমাণিত। বোঝা যায়, সমাজজীবনে মূল্যবোধের সংকট তাদের ভাবিয়েছে এবং সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা ব্যতিরেকে কোন জ্ঞান কোন প্রগতিশীলতার দাবি যে অসার, সেটা তাদের ধাক্কা দিয়েছে। ঠাসা বুনটের সংলাপ এবং কিছু ঘটনার বিবরণ, ছিমছাম দৃশ্যসজ্জা, মাঝে মাঝে ক্লাইম্যাক্স এবং তার সঙ্গে উচ্চাঙ্গের অভিনয়, এখানেই নাট্যসংস্থা হিসাবে বহুরূপীর কৃতিত্ব। ভবিষ্যতে আরও সার্থক প্রযোজনার প্রত্যাশা থেকে গেল। ¤ (পথিকৃৎ-এর অক্টোবর ২০০৫ সংখ্যা থেকে নেওয়া)

পথিকৃৎ

আমাদের পত্রিকা ওয়েবসাইটের সাথে যুক্ত থাকুন এবং সর্বশেষ খবর ও গুরুত্বপূর্ণ আপডেট নিয়মিত পান

যোগাযোগ

পথিকৃৎ
৮৮বি বিপিন বিহারী গাঙ্গুলী স্ট্রিট
কলকাতা ৭০০০১২

দূরাভাষ- 9433046280, 9433451998
ইমেইল- pathikritpatrika@gmail.com

গুরুত্বপূর্ণ লিংকসমূহ

© Pathikrit. All Rights Reserved. Designed By GenxByte