সোমবার, ১৮ মে ২০২৬

আমাদের সম্পর্কে


'পথিকৃৎ' পত্রিকা প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৬৩ সালের অক্টোবর মাসে। তখন পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বামপন্থী আন্দোলনের উত্তাল তরঙ্গে প্রবলভাবে আলোড়িত। ১৯৫৯ সালের খাদ্য আন্দোলনে এসপ্ল্যানেড ইস্টে পুলিশের লাঠিচার্জে ৮০ জন মানুষ শহিদের মৃত্যু বরণ করেন। গণতান্ত্রিক অন্দোলনের উপর পুলিশ যেভাবে বর্বর অক্রমণ চালিয়েছিল তার বিরুদ্ধে নাগরিক সমাজের মধ্য থেকে প্রতিবাদ গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। তার জন্য বুদ্ধিজীবী, শিল্পী, সাহিত্যিক এবং অন্যান্য ক্ষেত্রের গণতান্ত্রিক চেতনাসম্পন্ন মানুষকে নিয়ে একটি সংগঠন গড়ে তোলার চেষ্টা হয়। কলকাতার কসবা অঞ্চলে এই বিষয়ে একটি সভার আয়োজিত হয়। নাগরিক অধিকার রক্ষার আন্দোলন (সিভিল লিবার্টি মুভমেন্ট) গড়ে তোলার জন্য সেই সভায় সিদ্ধান্ত হয়। তখন ঠিক হয় একটা পত্রিকা প্রকাশ করা হবে তাতে বিভিন্ন বিষয়ের উপর মৌলিক মননশীল লেখা থাকবে। মূলত হবে একটা প্রবন্ধ পত্রিকা। এইভাবেই 'পথিকৃৎ'-এর জন্ম।

এখানে তখন সে-অর্থে কোনও লেখক কেউ ছিলেন না। তাই ঠিক হল, কোনও একটি বিষয়ে নিজেদের মধ্যে আলাপ আলোচনার পর পয়েন্টগুলিকে মোটামুটিভাবে লিপিবদ্ধ করে একজন কাউকে দায়িত্ব দেওয়া হবে ভাষায় রূপ দেওয়ার। তারপর আবার সকলে মিলে সেই লেখা নিয়ে আলোচনা হত। পরিবর্তন, পরিমার্জন করা হত। তারপর ছাপা হত 'পথিকৃৎ'-এ। গোটা বিষয়টা ছিল সমষ্টিগত প্রক্রিয়া। কোনও একটা বিষয় নিয়ে লেখা একজন লিখছেন, তাঁর নামে ছাপাও হচ্ছে কিন্তু কোনও লেখাই কারও একার সৃষ্টি নয়। সকলে মিলে সমষ্টিগতভাবে তৈরি হত প্রতিটি লেখা। লেখক কে, সেটা বড় প্রশ্ন ছিল না। সকলের সমষ্টিগত চিন্তাগুলিকে একত্রিত করে লেখায় রূপ দেওয়ার চেষ্টা হত। এর উদ্দেশ্য ছিল প্রত্যেকের চিন্তাকে সমষ্টিগত প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে একটা কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে যাওয়া।

'পথিকৃৎ'-এর একটি নাট্যগোষ্ঠী গড়ে উঠেছিল। এক্ষেত্রে শ্রদ্ধেয় ভোলা দত্তের নাম উল্লেখযোগ্য। নাট্যব্যক্তিত্ব প্রণব চক্রবর্তী, গোরা চট্টোপাধ্যায়, ঋষি চক্রবর্তী প্রমুখ 'পথিকৃৎ'-এর আদর্শের কথা শুনে আকৃষ্ট হন। তখন 'বিশে জুন' বলে একটা নাটক মঞ্চস্থ হয় এবং প্রশংসিতও হয়। এর পরে 'স্ট্রাইকার্স', 'বৈকুণ্ঠের উইল', 'আবর্ত', 'মুক্তি' প্রভৃতি অনেক প্রযোজনা হয়। মুম্বইয়ের শিবাজি পার্কের নামজাদা দূর্গাপুজায় দু'দিন দুটি পূর্ণাঙ্গ নাটক 'বৈকুণ্ঠের উইল', আর 'পণ্ডিতমশাই' অভিনীত হয় এবং প্রশংশিত হয়। 'ল অ্যান্ড অর্ডার' প্রভৃতি পোস্টার ড্রামাও হয়। তার পরে পথিকৃৎ-এর একটি সঙ্গীত গোষ্ঠীও গড়ে ওঠে। অনুপম সরকারের পরিচালনায়। এই গোষ্ঠী শ্রদ্ধেয় হেমাঙ্গ বিশ্বাসের সাহচর্য পেয়েছিল।

শরৎ শতবার্ষিকীর সময়ে রামকৃষ্ণ মিশনের পক্ষ থেকে গোলপার্কে একটা সেমিনার হয়েছিল, সেখানে বহু গুণীজনের সাথে শরৎচন্দ্রের জীবনীকার বিষ্ণু প্রভাকরকেও তাঁরা ডেকেছিলেন। সেই সভার পরদিন বাড়িতে মানিক মুখোপাধ্যায়কে দেখে বিষ্ণু প্রভাকর বললেন, আপনি কি 'ট্রেন্ড'-এর সম্পাদক মানিক মুখার্জি? হ্যাঁ, বলতে ওনার বই 'আওয়ারা মসিহা' নিয়ে এসে খুলে দেখালেন, শেষ পৃষ্ঠায় কৃতজ্ঞতা স্বীকারে আছে ট্রেন্ডের 'সম্পাদক হিসাবে মানিক মুখোপাধ্যায়ের নাম। বললেন, আপনি আমার বহু পরিচিত, আপনার সম্পাদিত 'ট্রেন্ড' থেকে আমি উদ্ধৃতি দিয়েছি আমার বইতে। বিষ্ণু প্রভাকর ও প্রখ্যাত গুজরাতি কবি উমাশঙ্কর যোশীকে কেন্দ্র করে পথিকৃৎ-এর উদ্যোগে গঠিত হয়েছিল সারা ভারত শরৎ শতবার্ষিকী কমিটি। পশ্চিমবঙ্গে শরৎ শতবর্ষ কমিটি গঠিত হয়েছিল প্রখ্যাত সাহিত্যিক বনফুলের সভাপতিত্বে। এর সম্পাদক ছিলেন পথিকৃৎ-এর সম্পাদক মানিক মুখোপাধ্যায়।

'পথিকৃৎ'-এর পক্ষ থেকে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি করা হয়েছে। নজরুল জয়ন্তী, শরৎ জয়ন্তীতে 'পথিকৃৎ' বড় অনুষ্ঠান করত। সেই সমস্ত অনুষ্ঠানেই এ যুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মার্কসবাদী দার্শনিক শিবদাস ঘোষ শরৎচন্দ্রের সাহিত্য নিয়ে অনেক অমূল্য আলোচনা করেছেন। সাংস্কৃতিক আন্দোলনের প্রশ্নে সেই আলোচনাগুলি গাইডলাইন হিসাবে কাজ করছে। তাঁর শিক্ষার আলোকে ভারতীয় নবজাগরণের আপসহীন ধারার প্রতিনিধি হিসাবে বিদ্যাসাগর, শরৎচন্দ্র ও নজরুলের যথার্থ মূল্যায়ন দেশের মানুষের সামনে তুলে ধরায় সর্বতো প্রয়াসী হয় পথিকৃৎ। দেশের শাসকশ্রেণি তাদের নিজেদের শ্রেণিস্বার্থে বিদ্যাসাগর, শরৎচন্দ্রের প্রকৃত চর্চা কখনওই চায়নি। নজরুলের ক্ষেত্রেও বিষয়টা তাই। অন্যান্য সাংস্কৃতিক সংগঠনও সঠিক চেতনা ও দৃষ্টিকোণ না থাকার দরুণ শরৎচন্দ্র ও নজরুলকে বলতে গেলে অপাঙক্তেয় করেই রেখেছিল। 'পথিকৃৎ' এই বন্ধ্যাত্ব ভেঙে শরৎ চিন্তা ও শরৎ সাহিত্যের উৎকর্ষ, চর্চা ও অনুধাবণের প্রয়োজনীয়তাকে মানুষের সামনে তুলে ধরে। নজরুলকে নতুন ভাবে চিনতে শেখায়।

সাংগঠনিক শক্তির সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও, শ্রেণিদৃষ্টিভঙ্গির ভিত্তিতে সাংস্কৃতিক আন্দোলনের একটা সুনির্দিষ্ট ধারা তৈরি করেছে পথিকৃৎ। সাংস্কৃতিক আন্দোলন রাজনীতি বর্জিত নয়। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক আন্দোলন থেকে সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সূচনা। আবার সেই সাংস্কৃতিক আন্দোলন রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক আন্দোলনকে প্রভাবিত করে। এইভাবেই সমাজটা চলে। কিন্তু আজ রাজনীতির ক্ষেত্রে যে সর্বব্যাপক অবক্ষয় দেখা যাচ্ছে, সাংস্কৃতিক আন্দোলনের ক্ষেত্রেও একই ধরনের অবক্ষয় চলছে। আমরা কী করব? আমরা কি অবক্ষয়ের স্রোতে গা ভাসাব? না কি স্রোতের বিরুদ্ধে দাঁড়াব? স্রোতের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে মানুষের জীবনকে দেখতে গিয়ে, তার সুখ দুঃখ, ব্যথা বেদনাকে বোঝা; কেন এগুলি ঘটছে তার কারণটাকে রসের মাধ্যমে প্রকাশ করার মধ্য দিয়েই শ্রমিকশ্রেণির সাহিত্য গড়ে উঠবে। তাই সাহিত্য-শিল্প সম্বন্ধে যথার্থ দৃষ্টিকোণটি জোরের সঙ্গে যুক্তি সহকারে তুলে ধরা দরকার। বাস্তবতার নামে অশ্লীলতার প্রচারটাই যে শ্রমিক-কৃষকের সাহিত্য নয়, এ কথাটা তখন জোরের সঙ্গে 'পথিকৃৎ'-ই তুলে ধরেছিল। সাহিত্যে রিয়েলিজম যে অভিজ্ঞতাবাদী দর্শন প্রসূত ন্যাচারালিজম নয়, এটাকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য 'পথিকৃৎ' প্রচারাভিযান আরম্ভ করে।

এখন যাঁরা কিছুটা লেখালেখি করেন, লিটল ম্যাগাজিন চালান, তাঁদের বেশিরভাগই এগুলি ভাবেন না। সমাজের থেকে তাঁদের সামনে এই ভাবনার দিকনির্দেশটিও আসে না। বলা হয়, 'culturul revolution preceeds technical revolution'। সাংস্কৃতিক আন্দোলনটা এই জন্যই এত গুরুত্বপূর্ণ। সাংস্কৃতিক আন্দোলন মানে গান, বাজনা, নাচ এই সব শুধু নয়। এর মানে হল চিন্তার আন্দোলন। আদর্শগত ক্ষেত্রে আন্দোলন। শিবদাস ঘোষ বলতেন, মানুষের মননশীলতার সামগ্রিক সুন্দরতম প্রকাশই হল সংস্কৃতি। এই মননশীলতা গড়ে উঠছে সমাজ থেকে, এবং কোন শ্রেণির চিন্তা সেখানে কাজ করছে তা সচেতনভাবে বুঝতে হবে। শিল্প- সাহিত্য হল ভাবনার রসরূপ প্রকাশ। 'কী হচ্ছে' আর যথার্থ সামজিক দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী 'কী হওয়া উচিত' এই দুটি নিয়েই শিল্প-সাহিত্যের বাস্তবতা। 'পথিকৃৎ' নানা কিছুর মধ্য দিয়ে এই জিনিসটা আনার চেষ্টা করছে। ¤

পথিকৃৎ

আমাদের পত্রিকা ওয়েবসাইটের সাথে যুক্ত থাকুন এবং সর্বশেষ খবর ও গুরুত্বপূর্ণ আপডেট নিয়মিত পান

যোগাযোগ

পথিকৃৎ
৮৮বি বিপিন বিহারী গাঙ্গুলী স্ট্রিট
কলকাতা ৭০০০১২

দূরাভাষ- 9433046280, 9433451998
ইমেইল- pathikritpatrika@gmail.com

গুরুত্বপূর্ণ লিংকসমূহ

© Pathikrit. All Rights Reserved. Designed By GenxByte