সকলেই শোকে মুহ্যমান। কেউ ভেঙে পড়ছেন কান্নায়। অথচ যে মানুষটিকে ঘিরে এই ব্যথার আবহ, সেই সক্রেটিস-এর চেহারায় ভয় বা শোকের চিহ্নমাত্র নেই। সত্যানুসন্ধান, প্রচলিত সনাতন ধ্যানধারণার প্রতি জেহাদ ঘোষণা এবং ছাত্রদের সেই ভাবধারায় দীক্ষিত করার 'অপরাধে' যিনি মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত, যাকে বেঁধে রাখা হয়েছে লোহার শিকলে, যার উদ্যত হাতের সামনে বিষাক্ত হেমলকের পাত্র অপেক্ষা করছে মৃত্যুর পরোয়ানা নিয়ে-বিষন্নতার বৃত্তের মাঝে আলোককেন্দ্রের মতো অবস্থান করছেন সেই গ্রীক দার্শনিক। মৃত্যুর কয়েক মুহূর্ত আগেও তিনি ঋজু, প্রত্যয়ী, অটল। জ্যাক লুই ডেভিড-এর আঁকা সক্রেটিস-এর মৃত্যুদৃশ্যের এই প্রচ্ছদ 'অধ্যাপক সংহতি'র সাম্প্রতিক প্রকাশনাটির উদ্দেশ্য সম্পর্কে যে ইঙ্গিত দেয় তা আরও স্পষ্ট হয় মুখবন্ধের শুরুতেই। 'জনগণের অজ্ঞতাই সরকারের শক্তির উৎস। সরকার এটা জানে বলেই সে সর্বদাই যথার্থ শিক্ষাবিস্তারের বিরোধিতা করে।' লিও তলস্তয়ের এই সুপরিচিত উক্তি দিয়ে শুরু করে মুখবন্ধে সম্পাদক জানিয়েছেন, "ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র এদেশে শিক্ষা সংকোচনে যে দাওয়াইয়ের ব্যবস্থা করেছিল তা স্বাধীনতার পরও অব্যাহত থাকবে, শুধু তাই নয় স্বাধীনোত্তর জাতীয় সরকারগুলি শিক্ষায় আরও আরও হস্তক্ষেপের সুযোগ খুঁজবে, শিক্ষার স্বাধিকারের ন্যূনতম পরিসরটুকু কেড়ে নেবে, শিক্ষা প্রশাসনের প্রতিটি স্তরকে শাসকের অবাধ বিচরণক্ষেত্রে পরিণত করবে, তা নিশ্চিত ভাবে রেনেসাঁস যুগের শিক্ষাবিদদের স্বপ্নেরও অতীত ছিল। ...বর্তমান বিজেপি পরিচালিত কেন্দ্রীয় সরকার কীভাবে গণতান্ত্রিক শিক্ষাকে ধ্বস্ত করছে তা আমরা মর্মে মর্মে উপব্ধি করছি। পশ্চিমবঙ্গে বর্তমান শাসকদলটি তার পূর্বসূরি অনুসৃত শিক্ষাক্ষেত্রে দলতন্ত্রের বিরোধিতা করতে করতে ক্ষমতাসীন হওয়ার পর আরও নগ্নভাবে কেমন তার পরম্পরা বজায় রেখে চলেছে তাও আমরা সম্যক ভাবে জানি। এই পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের মনে হয়েছে শিক্ষা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের স্বাধিকার সম্পর্কে একটা সার্বিক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলার কাজটা আজ খুব জরুরি। এই উদ্দেশ্য থেকেই অধ্যাপক সংহতি পত্রিকার পক্ষ থেকে 'আক্রান্ত স্বাধিকার বিপন্ন শিক্ষা' শিরোনামে এই পুস্তক রচনার প্রয়াস।" শিক্ষার স্বাধিকারের দাবি নতুন নয়। শিক্ষাক্ষেত্রে গণতন্ত্র থাকা উচিত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পঠনপাঠন-গবেষণা-জ্ঞানচর্চার সুস্থ পরিবেশ থাকা উচিত, স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে দলতন্ত্রের অনুপ্রবেশ বন্ধ হওয়া উচিত-এসব বিষয়ে মোটামুটি সকলেই একমত। পশ্চিমবঙ্গের বুকে কংগ্রেসি জমানা এবং বিগত বামফ্রন্ট সরকার থেকে আজকের তৃণমূল সরকারের জমানা পর্যন্ত শিক্ষার স্বাধিকার যে বারবার আক্রান্ত, অবমানিত হয়েছে এবং হচ্ছে, বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্র ভর্তি-ফি নির্ধারণ-শিক্ষক নিয়োগ থেকে শুরু করে পরীক্ষাব্যবস্থা-মূল্যায়ন-গবেষণার সুযোগ-অনুদান ইত্যাদি কোনওক্ষেত্রেই যে কাঙিক্ষত স্বচ্ছতা বজায় থাকছেনা-সংবাদপত্রের পাতা, ইলেকট্রনিক মিডিয়া এবং দৈনন্দিন জীবনের অভিজ্ঞতা থেকেও সাধারণ মানুষ এগুলো কিছুটা টের পান। কিন্তু এই ভাসাভাসা অগভীর ধারণা এবং তথ্যচর্চার আড়ালে থেকে যায় বহু প্রয়োজনীয় প্রসঙ্গ।শিক্ষার স্বাধিকার বলতে ঠিক কি বোঝায়? এই স্বাধিকারের ধারণা গড়ে ওঠার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট কী? কেনই বা স্বাধিকার প্রয়োজন? শিক্ষাজগতের ভালোমন্দ কি দেশের আর্থসামাজিক এবং রাজনৈতিক পরিমণ্ডল থেকে বিচ্ছিন্ন? নাকি শিক্ষার স্বাধিকারের প্রশ্নটি ভীষণভাবেই বিদ্যমান সমাজব্যবস্থার সাথে যুক্ত? আজকের দিনে বিভিন্ন সরকারী নিয়মনীতি বা আইন শিক্ষার উন্নতি, শিক্ষার বিস্তার, শিক্ষার উৎকর্ষের গালভরা বুলি আউড়েই শিক্ষার সুযোগ-পরিবেশ-স্বাধিকার 'কে হত্যা করছে কীভাবে? শুধুমাত্র কিছু মানুষের সদিচ্ছা বা সততা দ্বারা কি শিক্ষার এই সর্বনাশ আটকানো সম্ভব? নাকি প্রয়োজন একটি সঠিক দৃষ্টিভঙ্গির ভিত্তিতে গড়ে ওঠা আন্দোলন? এক্ষেত্রে কেমন হওয়া উচিত শিক্ষক ও ছাত্রসমাজের ভূমিকা? এমন বহু জরুরি প্রশ্নের উত্তর খোঁজা হয়েছে সংকলনটির নানা রচনা ও নিবন্ধে। বইয়ের লেখাগুলিকে বিষয় ও প্রকৃতি অনুযায়ী পাঁচটি পর্যায়ে ভাগ করা হয়েছেঃ চয়ন, অভিভাষণ, নিবন্ধ, পর্যালোচনা এবং অভিমত। আশি-নব্বইয়ের দশকে গড়ে ওঠা ঐতিহাসিক ভাষাশিক্ষা আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে প্রকাশিত ইতিহাসবিদ নীহাররঞ্জন রায় এবং বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক মানিক মুখোপাধ্যায়ের দুটি লেখা ('প্রতিবাদের ভাষা' পুস্তিকা থেকে গৃহীত) পাওয়া যায় চয়ন অংশে। ক্ষমতায় এসে তৎকালীন বামফ্রন্ট সরকার কিভাবে শিক্ষাজগতের সাথে যুক্ত বিশিষ্ট মানুষদের মতামতের তোয়াক্কা না করে, শিক্ষার স্বাধিকারের স্বপ্নকে ধুলোয় মিশিয়ে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেনেট-সিন্ডিকেট-অ্যাকাডেমিক কাউন্সিল ভেঙে দিয়ে শাসক সরকারের মনোনীত কাউন্সিল গঠন করে এবং একে একে অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ, স্কুলের আর্থিক প্রশাসনিক সমস্ত ক্ষেত্রে দলীয় লোক বসিয়ে নিজেদের একচ্ছত্র কর্তৃত্ব কায়েম করে সেই লজ্জাকর ইতিহাস বিধৃত নীহাররঞ্জন রায়ের 'প্রতিবাদের কণ্ঠ' লেখাটিতে। মানিক মুখোপাধ্যায়ের প্রবন্ধটি শিক্ষার স্বাধিকার রক্ষার আন্দোলনে এক মূল্যবান দিকনির্দেশ। বামফ্রন্টের শিক্ষানীতি, দল ও সরকার নির্বিশেষে শিক্ষার স্বাধিকার হরণে শাসকের ঝোঁক, ইতিহাসের গতিপথে সমাজ বিবর্তনের ধারায় স্বাধিকার সংক্রান্ত ধারণার পরিবর্তন, একসময় শিক্ষার স্বাধিকারের সপক্ষে দাঁড়ানো বুজােয়া রাষ্ট্র আজ ক্ষয়িষ্ণু সঙ্কটগ্রস্ত পুঁজিবাদের যুগে নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার তাগিদে কীভাবে মানুষের প্রতিটি মৌলিক অধিকারের ওপর হস্তক্ষেপ করছে-এই প্রশ্নগুলি বিশ্লেষিত হয়েছে সেখানে। বামফ্রন্টের এই শিক্ষানীতি সেসময় শুধু শিক্ষাজগতকেই বিপন্ন করেনি, মার্কসবাদ ও কমিউনিজম-এর মহান আদর্শ সম্পর্কে সাধারণ মানুষ ও বুদ্ধিজীবীদের একাংশের মধ্যে বিভ্রান্তির সৃষ্টি করেছে, বাজারি সংবাদপত্রও এই প্রচারে গলা মিলিয়েছে। এই অপপ্রচারকে স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করে লেখক বলেছেন, "বামফ্রন্টের এই ভাষা ও শিক্ষানীতির সঙ্গে মার্কসবাদের কোন সম্পর্কই নেই। ওঁরা মার্কসবাদের কথা বলে কিংবা জনস্বার্থের ধুয়ো তুলে এ কাজগুলি করতে পারেন, কিন্তু ওঁদের কাজ আসলে মার্কসবাদ ও জনস্বার্থবিরোধী-মার্কসবাদী দৃষ্টিভঙ্গির পরিপন্থী। ... যারা বামফ্রন্ট সরকারের স্বাধিকার হরণের নির্লজ্জ চেহারাটা দেখে মনে করছেন যে এটাই কমিউনিস্টদের রীতি তাঁরা খেয়াল করছেন না, সারা দেশেই আজ এই ধারাটা জোরালো হয়ে উঠছে। কেন? এটা কিসের লক্ষণ? ...ইতিহাস ও যুক্তিবিজ্ঞানের সাহায্যে বিষয়টা তলিয়ে বিচার করলে দেখা যাবে দেশের সামাজিক-অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক ব্যবস্থা ও অবস্থার সঙ্গে এই ঝোঁকের একটা নিগূঢ় সম্পর্ক আছে। যে শাসকশ্রেণী এই ব্যবস্থা পরিচালনা করছে, রাষ্ট্রযন্ত্রটি যার নিয়ন্ত্রণে, এই ঝোঁকটা আসলে তারই। মার্কসবাদী বিচারধারা বা দৃষ্টিভঙ্গির এটা একটা মূল কথা"। স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় ব্রিটিশ শাসকের শিক্ষার স্বাধিকারের ওপর আক্রমণ এবং স্বাধিকার রক্ষার লড়াইয়ের অন্যতম পুরোধা আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের সেই বিখ্যাত উক্তি মনে করিয়েছেন প্রবন্ধকার, "সরকারের প্রশাসনযন্ত্রের অঙ্গ হব না আমরা। ওঁরা কী দিতে চাইছেন? আড়াই লক্ষ টাকা। আর আপনারা প্রস্তাব করছেন যে প্রতিদানে আমাদের স্বাধীনতা দিয়ে দেবো। ভবিষ্যৎ বংশধরেরা কি ধিক্কার দিয়ে বলবে না যে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেনেট আড়াই লক্ষ টাকার বিনিময়ে স্বাধীনতা বিক্রি করেছে, আমরা এ অর্থ নেবো না। ...আমাদের স্নাতকোত্তর বিভাগের শিক্ষকরা বরং না খেয়ে থাকবেন, তবু স্বাধীনতা ছাড়বেন না। ... স্বাধীনতা প্রথম, স্বাধীনতা দ্বিতীয়, স্বাধীনতা সর্বদা-অন্য কোনও কিছুতেই আমি তৃপ্ত হবো না"। এভাবেই সেদিন জাতীয় মুক্তি আন্দোলনের সাথে শিক্ষার স্বাধিকারের দাবি সম্পৃক্ত হয়ে ছিল। আবার বুর্জোয়া শ্রেণির প্রগতিশীল ভূমিকা যা ধর্মীয় অন্ধবিশ্বাস, চার্চ ও পুরোহিত-তন্ত্রের আধিপত্য এবং অধ্যাত্মবাদি চিন্তার বন্ধন থেকে শিক্ষাকে মুক্ত করে পরীক্ষানিরীক্ষা-যুক্তিবিজ্ঞান-আলোচনা-বিতর্কের ভিত্তিতে সত্যানুসন্ধানের স্বাধীনতাকে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিল সময়ের সাথে সাথে তা নিঃশেষিত হয়ে অর্থনীতিতে একচেটিয়া পুঁজির অনুপ্রবেশ ও কেন্দ্রীকরণ, সাম্রাজ্যবাদের জন্ম এবং শিক্ষা-সংস্কৃতি'র পরিমণ্ডলে স্বাধিকার হরণের সূচনা। আজ পুঁজিবাদী রাষ্ট্রযন্ত্রের রক্ষক হিসাবে সরকারি ক্ষমতায় আসা দলগুলি সমস্ত দিক থেকে সাধারণ মানুষের মানুষ হয়ে ওঠার পথ রুদ্ধ করতে চায়, যথার্থ জ্ঞানচর্চার সুযোগ আটকাতে চায়-কারণ শোষিত-বঞ্চিত মেহনতি মানুষের জ্ঞানই আজ পুঁজিবাদের মৃত্যুবাণ। আজকের দিনে শিক্ষার স্বাধিকার রক্ষার আন্দোলনের মূল দৃষ্টিভঙ্গি কী হওয়া উচিত মার্কসবাদী চিন্তার আলোয় তা দেখিয়েছেন লেখক, "আজকের পরিপ্রেক্ষিতে শিক্ষায় স্বাধিকারের সঠিক অর্থ হল পুঁজিবাদী শৃঙ্খল থেকে মুক্তির প্রয়োজনে জ্ঞান অর্জনের স্বাধীনতা, রাষ্ট্রযন্ত্রের নিয়ন্ত্রণের বিরুদ্ধে স্বাধিকার। আত্মমর্যাদার ভিত্তিতে সুস্থ স্বাধীন মানুষ হিসাবে গড়ে ওঠার স্বার্থে যথার্থ শিক্ষালাভের স্বাধীনতা ও স্বাধিকার"। বামফ্রন্টের ভাষা ও শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা ভাষাশিক্ষা আন্দোলনে সামনের সারিতে ছিলেন বহু খ্যাতনামা সাহিত্যিক, অধ্যাপক, শিল্পী, বিজ্ঞানী, চিকিৎসক এবং আরও অনেক বিশিষ্ট মানুষ। শিক্ষা যখন বিপন্ন, তখন 'বিশুদ্ধজ্ঞানচর্চা' বা 'অরাজনৈতিক থাকা'র অজুহাতে তাঁরা নিজেদের আন্দোলনের ময়দান থেকে দূরে সরিয়ে রাখেননি। সময়ের আহ্বানে সাড়া দিয়ে সর্বস্তরের সাধারণ মানুষের সাথে শিক্ষার স্বাধিকার রক্ষার্থে রাস্তায় নেমেছেন, দীর্ঘ উনিশ বছরের সংগ্রামের শেষে সেই মহৎ আন্দোলন জয়যুক্তও হয়েছে। শাসকের তল্পিবাহক সংবাদমাধ্যমের কল্যাণে প্রায় আড়ালে থেকে যাওয়া সেই গৌরবময় দিনগুলির উত্তাপ আজকের পাঠক কিছুটা অনুভব করতে পারবেন এই প্রাঞ্জল রচনা দুটি থেকে। প্রখ্যাত ভাষাতত্ত্ববিদ ও বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী নোয়াম চমস্কি, বাংলাদেশের অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ এবং রাজ্য সরকারের প্রাক্তন অ্যাডভোকেট জেনারেল বিমল চ্যাটার্জি'র তিনটি ভাষণ নিয়ে বইয়ের দ্বিতীয় পর্যায় 'অভিভাষণ'। নোয়াম চমস্কি'র ভাষণের শিরোনাম 'অ্যাকাডেমিক স্বাধীনতা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের বাণিজ্যিকীকরণ' হলেও ভাষণটির মূল আকর্ষণ এবং কেন্দ্রবিন্দু হল আমেরিকার শিক্ষাজগতের অবনমন, যেখানে গণতন্ত্রের ধবজা উড়িয়েই প্রত্যক্ষ রাষ্ট্রীয় মদতে অর্থনীতির সামরিকীকরণ, উচ্চশিক্ষার বেসরকারিকরণ, মুষ্টিমেয় সুবিধাভোগীর হাতে সমস্ত সম্পদের কেন্দ্রীকরণের মতো চূড়ান্ত অগণতান্ত্রিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। বহু মূল্যবান তথ্যসমৃদ্ধ ভাষণটিতে চমস্কি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলেছেন, "বেসরকারিকরণ বলতে অবশ্যই বোঝায় শিক্ষাকে কিছু ধনী মানুষের জন্য কুক্ষিগত করা এবং সমাজের বাকিদের জন্য কেবলমাত্র স্বল্প মেধার কারিগরি শিক্ষার ব্যবস্থা। আর এই ঘটনা সারাদেশব্যাপী ঘটে চলেছে"। এই পরিস্থিতিতে কোনও পক্ষ অবলম্বন না করে নিষ্ক্রিয় থাকা যে শোষকের পক্ষ নেওয়ার সমার্থক হয়ে দাঁড়ায় তা স্পষ্ট হয়ে যায় যখন চমস্কি বলেন, "পছন্দের অন্য দিকটি হল, একে জীবনের স্বাভাবিক ঘটনা বলে স্বীকৃতি দেওয়া এবং যখন আমি আমার কাজে যোগ দেব, তখন আমাকে লকহিড মারটিন লেকচার হলের পাশ দিয়ে হেঁটে যেতে হবে; অফিসে জানালার দিকে তাকালে চোখে পড়বে কোচ বিল্ডিং যেটি শত শত কোটি ডলারের মালিকের নামে নামকরণ করা হয়েছে, যারা চা-চক্রের মূল আর্থিক দাতা, যারা শ্রমিক আন্দোলনকে মুছে দেওয়ার প্রচারে অগ্রণী এবং যারা প্রতিষ্ঠানটিকে কর্পোরেট উৎপীড়নের জায়গা হিসেবে দেখতে চায়”। আজ, এই মুহূর্তে আমাদের দেশে, এই রাজ্যে ঠিক এইভাবেই উন্নয়ন আর উৎকর্ষের মিথ্যে ধুয়ো তুলে বিভিন্ন ঐতিহ্যময় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে কর্পোরেট সেক্টরে পরিণত করার চেষ্টা চলছে। আর এসবের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ সংগঠিত হলেই দমনপীড়ন নামিয়ে আনা হচ্ছে 'শৃঙ্খলারক্ষা'র নামে। মজার ব্যাপার হল; যে শাসকদলের ছাত্রসংগঠন কলেজে কলেজে দুর্নীতি-দাদাগিরি-তোলাবাজি'র মতো অসংখ্য অপকর্ম করে বেড়াচ্ছে সেই দলই সরকারি ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে 'অরাজনৈতিক' করার নামে সমস্তরকম বিরুদ্ধ স্বরের কণ্ঠরোধ করতে চাইছে। ছাত্র এমনকী শিক্ষকসমাজেরও কোনওরকম মতপ্রকাশ বা প্রতিবাদ করার স্বাধীনতা কেড়ে নিতে চাইছে। ভারত হোক বা বাংলাদেশ বা আমেরিকা-পুঁজিবাদী আগ্রাসনের রূপটা কমবেশি একইরকম। অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্ট আয়োজিত পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় কনভেনশনের এই ভাষণে বলেছেন, সঠিক রাজনৈতিক অবস্থান দ্বারাই একমাত্র এই ধ্বংস রোখা সম্ভব। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলির গবেষণা-জ্ঞানচর্চার পরিবেশ সুপরিকল্পিত ভাবে নষ্ট করা হচ্ছে বাণিজ্যিক মুনাফালাভের কথা মাথায় রেখে। এই বাণিজ্যমুখী শিক্ষাব্যবস্থা কীভাবে মানুষের সামাজিক দায়বদ্ধতার জায়গাটা সমূলে শেষ করে দেয় সেই প্রসঙ্গে অধ্যাপক মুহাম্মদ বলেছেন, "কিন্তু বাণিজ্যিক বিষয়টা যদি প্রধান হয় তখন একজন বিজ্ঞানীর মূল লক্ষ থাকে কোন ধরণের গবেষণা করলে বা কোন ধরণের রিপোর্ট লিখলে সে বেশি টাকা পাবে। সে বিবেচনা করবে, 'সুন্দরবনবিনাশী রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র হলে সুন্দরবন শেষ হবে' এই সত্য গবেষণান্ধ হলেও তা লিখলে কি আমার অসুবিধাজনক হবে না, 'রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র হলেও সুন্দরবনের ক্ষতি হবেনা' এই লেখা-বলাই আমার জন্য লাভজনক? আমরা তাই দেখি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এমন এক ধরণের এক্সপার্ট তৈরি হচ্ছে যারা বিভিন্ন কর্পোরেট গ্রুপ, দেশি কিংবা বিদেশি মাল্টিন্যাশনাল কর্পোরেশন গ্রুপের এক একটা ইন্সট্রুমেন্টে পরিণত হয়েছে। ...এর বিরুদ্ধে শিক্ষক-শিক্ষার্থী যাদের মধ্যে ন্যূনতম বোধশক্তি আছে, দায়বদ্ধতা আছে, যাদের মধ্যে নিজে মানুষ হিসেবে বেঁচে থাকার আত্মসম্মানবোধ আছে তাদের প্রত্যেকেরই দায়িত্ব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ধবংসের যে অপতৎপরতা চলছে তার বিরুদ্ধে লড়াই করা"। কিছুদিন আগে এ রাজ্যের শিক্ষামন্ত্রী সরকারের নতুন বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ন্ত্রণ আইন প্রসঙ্গে বলেন, সরকারই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে টাকা দেয়, তাই তাদের ওপর খবরদারি করার অধিকার সরকারের আছে। এই উদ্ধত মন্তব্যের নিন্দা করে সেভ এডুকেশন কমিটি আহত সভায় মূল কথাটি মনে করিয়ে দিয়েছেন বিমল চ্যাটার্জি, "সরকার হচ্ছে রাজ্যের মানুষের অছি (Trustee), টাকা হচ্ছে রাজ্যের মানুষের, কোনো রাজনৈতিক দল বা সরকারের নয়। Welfare State (কল্যাণকামী রাষ্ট্র)-এর অন্যতম দায়িত্ব হচ্ছে রাজ্যে শিক্ষার ব্যবস্থা করা এবং প্রয়োজনে বিনা খরচায় শিক্ষার ব্যবস্থা করা। এটা নতুন কথা নয়"। কেন্দ্রীয় সরকারের শিক্ষায় গৈরিকীকরণের বিরুদ্ধেও সংঘবদ্ধ প্রতিরোধ গড়ে তোলার কথা বলেছেন তিনি। বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভব, অ্যাকাডেমিক স্বাধীনতার ঐতিহাসিক ভিত্তি, নবজাগরণ পূর্ববর্তী অধ্যায়ে গ্রীস, ইতালি, ফ্রান্স, রোম সহ বিভিন্ন দেশে সক্রেটিস, ক্রনো, গ্যালিলিও সহ বিভিন্ন দার্শনিক-চিন্তাবিদ-বিজ্ঞানী দের সাথে চার্চের সংঘাত ও সত্য বলার অপরাধে তাদের ওপর নেমে আসা নারকীয় অত্যাচারের কাহিনী, হিটলারের নাৎসি জার্মানিতে ইহুদি ও কমিউনিস্টদের ওপর দমনপীড়ন, মনীষীদের চিন্তায় অ্যাকাডেমিক স্বাধীনতার রূপ, বাংলার বুকে আধুনিক শিক্ষা প্রবর্তন এবং শিক্ষাবিস্তারের জন্য ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাাগরের অসামান্য লড়াই, ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে ছাত্রসমাজের অংশগ্রহণ নিষিদ্ধ করার কার্লাইল সার্কুলারের বিরুদ্ধে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রতিবাদ, ব্রিটিশ সরকারের অসম্মানজনক শর্তের সামনে দাঁড়িয়ে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাধিকার রক্ষায় আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় ও আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের মতো শিক্ষকদের স্মরণীয় ভূমিকা, বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাধিকারের নানা দিক সহ বহু জরুরি প্রসঙ্গ এসেছে 'নিবন্ধ' অংশের অন্তর্গত লেখাগুলোয়। যে আমেরিকা নিজেকে গণতন্ত্রের পীঠস্থান বলে দাবি করে এবং ইতিহাস সম্পর্কে সাধারণ মানুষের অজ্ঞতার সুযোগে কমিউনিজমের বিরুদ্ধে ব্যক্তিস্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ সহ নানা মিথ্যে অভিযোগ আনে সেই আমেরিকার বুকে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার যথার্থ স্বরূপ কেমন ছিল? 'ইতিহাসে বিশ্ববিদ্যালয় ও অ্যাকাডেমিক স্বাধীনতা' নিবন্ধে প্রচারের আড়ালে থেকে যাওয়া এই অত্যন্ত দরকারি ইতিহাসের উল্লেখ পাওয়া যায়, "যেসব শিক্ষক দাসত্ব, বিচ্ছিন্নতা এবং ডারউইনবাদ সম্পর্কে রাষ্ট্রের সঙ্গে সহমত পোষণ করতেন না, তাদের চাকরি থেকে বহিষ্কার করে দেওয়া হয়। উনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীতেও অ্যাকাডেমিক স্বাধীনতা গুরুতরভাবে লঙ্ঘন করা হয়। ঠাণ্ড যুদ্ধের সময়, কমিউনিজমের প্রতি সহানুভূতির কারণে বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাপকদের অনেককেই হয়রানির শিকার হতে হয়েছিল। ...মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে অ্যাকাডেমিক স্বাধীনতার অধিকার লঙ্ঘনের সর্বোত্তম দৃষ্টান্ত হল, বিশ্ববরেণ্য অধ্যাপক বারট্রান্ড রাসেল-এর নিউ ইয়র্ক সিটি কলেজে শিক্ষাদান নিষিদ্ধ করা (Tamirat, ২০১৫)"। এ প্রসঙ্গে আমাদের মনে পড়ে যায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী আমেরিকার প্রেক্ষাপটে রচিত হাওয়ার্ড ফাস্টের 'সাইলাস টিমবারম্যান' উপন্যাসের শান্তিপ্রিয় নির্বিরোধী অধ্যাপক সাইলাসের কথা। মার্ক টোয়েনের একটি গল্প পড়ানো, আমেরিকার প্রতিরক্ষাবাহিনীতে যোগ না দেওয়া এবং পরমাণু অস্ত্র নিষিদ্ধকরার আবেদনে সই করাকে কেন্দ্র করে যাঁর আপাত নিস্তরঙ্গ জীবনে ঝড় ওঠে, 'দেশপ্রেম আর গণতন্ত্রের' মুখোশ ছিঁড়ে আমেরিকান রাষ্ট্রের কুৎসিত আগ্রাসী স্বরূপ বেরিয়ে আসে। বিবেক ও মনুষ্যত্ব রক্ষার তাগিদে নিজস্ব ঘেরাটোপ থেকে বেরিয়ে এসে ধীরে ধীরে এই সাধারণ মানুষটি হয়ে ওঠেন যথার্থ স্বাধীনতারক্ষার যুদ্ধের এক অগ্রণী সৈনিক। এভাবেই মানুষকে পথে নামতে হয়, ভাবতে হয় চারপাশের ঘটনাবহুল পৃথিবীর ওঠাপড়া নিয়ে। সামাজিক সমস্যা সম্পর্কে উদাসীন, নিষ্ক্রিয় থেকে নিজের স্বাধীনতা কেউ রক্ষা করতে পারেন না। স্বাধিকার দাবি করার সাথে অঙ্গাঙ্গীভাবে যুক্ত এই দায়বদ্ধতার প্রশ্নটিও মনে করিয়ে দিয়েছেন 'বিশ্ববিদ্যালয় স্বাধিকারের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক' শীর্ষক নিবন্ধের লেখক। ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে বিধানসভায় গৃহীত 'পশ্চিমবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ (প্রশাসন ও নিয়ন্ত্রণ) আইন'টি শিক্ষার স্বাধিকার হরণে বর্তমান রাজ্য সরকারের একটি অতি সাম্প্রতিক পদক্ষেপ। 'দক্ষ ও প্রাণবন্ত' শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের স্বাধিকারকে সম্মান জানানোর ঘোষণা'র আড়ালে এই আইনটি কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে সরকারের আজ্ঞাবহ দাস তৈরির কারখানায় পরিণত করতে চাইছে। আর্থিক-প্রশাসনিক-সাংগঠনিক সমস্ত ক্ষেত্রে নিরঙ্কুশ সরকারি আধিপত্য কায়েম করা এবং শিক্ষক-অধ্যাপক'দের স্বাধীন মতপ্রকাশ, মুক্তচিন্তার চর্চা, প্রতিবাদের সমস্ত অধিকার কেড়ে নেওয়াই এই স্বৈরতান্ত্রিক আইনের উদ্দেশ্য। এই আইনটির বিভিন্ন ধারা উল্লেখ করে বিশদে আলোচনা করা হয়েছে 'পর্যালোচনা' পর্বের প্রথম দুটি লেখায়। তবে এই ধরণের অপচেষ্টার কৃতিত্বের দাবিদার শুধু বর্তমান রাজ্য সরকার এমনটা ভাবলে যে ভুল হবে সেকথাও উঠে এসেছে মন্তব্যে। সত্তর দশকে কংগ্রেস সরকারের তৈরি এক্সপেন্ডিচার কন্ট্রোল অ্যাক্ট এবং তথাকথিত প্রগতিশীল বামফ্রন্ট সরকারের আমলের কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় আইন, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় আইন সহ অন্যান্য আইনের ধারাবাহিকতাতেই আজকের তৃণমূল সরকারের এই সর্বনাশা আইনটি বিকশিত হয়েছে। স্বাধীনতা পরবর্তী অধ্যায়ে শিক্ষাক্ষেত্রে রাধাকৃষ্ণণ কমিশন, কোঠারি কমিশন থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত কেন্দ্রীয় সরকার নিযুক্ত বিভিন্ন কমিটি ও কমিশন এর ভূমিকা, একের পর এক নতুন আইন ও সুপারিশের মাধ্যমে উচ্চশিক্ষার সামগ্রিক ব্যবসায়ীকরণের ইতিহাস, সর্বোপরি ক্ষমতায় এসে বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকারের শিক্ষার গেরুয়াকরণ সাম্প্রদায়িকীকরণের এজেণ্ড, সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে আরএসএস ঘনিষ্ঠ মধ্যমেধার ব্যক্তিদের নিয়োগের বিপজ্জনক সিদ্ধান্ত এবং সাম্প্রতিককালে ইউজিসি প্রকাশিত কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত বিশ্ববিদ্যালয়গুলির স্বশাসন সংক্রান্ত ড্রাফট রেগুলেশন্স-এর নানাদিক তুলে ধরা হয়েছে পর্যালোচনার অন্যান্য লেখায়। উচ্চশিক্ষায় কেন্দ্র-রাজ্য উভয় সরকারের অন্যায় হস্তক্ষেপ ও দলতন্ত্র, আংশিক সময়ের অধ্যাপকদের সমস্যা এবং শিক্ষার অধিকার আইন ২০০৯ সংক্রান্ত আরও তিনটি রচনা নিয়ে বইয়ের শেষ পর্ব 'অভিমত'। প্রাথমিকে ইংরাজি তুলে দেওয়ার মতই পূর্বতন বামফ্রন্ট সরকারের আরেকটি মারাত্মক পদক্ষেপ ছিল প্রাথমিকে পাশ ফেল তুলে দেওয়া। এই সর্বনাশকে আরও পাকাপোক্ত করে কেন্দ্রের শিক্ষার অধিকার আইন ২০০৯ সরকারি ও সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত স্কুলে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পাশ ফেল তুলে দেয়। গোটা দেশের মানুষ এর বিরুদ্ধে ক্ষোভে ফেটে পড়েন, শিক্ষক-অধ্যাপক-শিল্পী-বুদ্ধিজীবী সহ সমাজের সর্বস্তরের সাধারণ মানুষের দীর্ঘ আন্দোলনের চাপে এ রাজ্যের সরকার ২০১৭ সালের জুলাইতে দাবি মেনে নিয়ে পরবর্তী শিক্ষাবর্ষে পাশ ফেল ফেরানোর প্রতিশ্রুতি দেয়। কোন শ্রেণি থেকে পাশ ফেল চালু হবে। তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি, নানা কুযুক্তি টালবাহানা করে এখনো বিলম্বিত করা হচ্ছে এমন একটি জরুরি সিদ্ধান্ত। এই পরিস্থিতিতে পাশ ফেল প্রথার অবলুপ্তি সংক্রান্ত তথ্য ও বিশ্লেষণ অত্যন্ত দরকারি। পারিবারিক গণ্ডির বাইরে স্কুলই সেই জায়গা যেখানে প্রথম একটি শিশু বা কিশোরের চিন্তা-মনন-দৃষ্টিভঙ্গি বিকশিত হয়। পাঠ্যপুস্তক, বিষয়ের উপস্থাপন, বিভিন্ন সহপাঠক্রমিক কর্মসূচি, মূল্যায়নের পদ্ধতি এসবই গভীরভাবে প্রভাবিত করে একজনের গড়ে ওঠাকে। স্কুলশিক্ষার জগতে আর্থিক সঙ্গ তির ভিত্তিতে বেসরকারি ইংরাজি মাধ্যম স্কুল ও সরকারি স্কুলের সুস্পষ্ট বিভাজন, সরকারি পাঠ্যপুস্তকের মানের অবনমন, বিজ্ঞানের বইয়ে ভুল বা ইতিহাস বইয়ে সত্যের বিকৃতি, শিক্ষকদিবসে বাধ্যতামূলকভাবে প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ শোনানোর ফতোয়া, স্কুলের দেওয়ালে সেনা জওয়ানদের ছবি টাঙানোর নির্দেশ -এ সবই স্কুলস্তর থেকেই শিক্ষার সুযোগ শুধুমাত্র ধনীদের কুক্ষিগত করা এবং অন্ধ সরকারি আনুগত্য তৈরির নীল নকশাকে নির্দেশ করছে। এই প্রেক্ষাপটে স্কুলশিক্ষার বর্তমান পরিবেশ-পরিস্থিতি নিয়ে আরও কিছু আলোচনা সংযোজিত হলে বইটি আরও সম্পূর্ণ হত বলে মনে হয়। শিক্ষকরা মানুষ গড়ার কারিগর, শিক্ষকতা অন্যান্য পেশার থেকে ভিন্ন মর্যাদার- এই কথাগুলো খুব পরিচিত হলেও আজকের পরিস্থিতিতে হয়ত বইয়ের পাতায় আটকে থাকা কিছু ভালো কথার মতো শোনাবে অনেকের কাছেই। শিক্ষক-অধ্যাপকরা সত্যিই মানুষের চিন্তাভাবনা দৃষ্টিভঙ্গির পরিমণ্ডলকে উন্নত করে তুলতে পারেন, অনুপ্রাণিত করতে পারেন, পথ দেখাতে পারেন। তাই ইতিহাসে, সাহিত্য-সিনেমা-নাটকে তাঁরা বারবার চরিত্র হয়ে উঠেছেন, গতানুগতিকতার পাল্টা স্রোতে সাঁতার কাটতে শিখিয়েছেন ছাত্রদের। গ্রামের স্কুলের কোনও অখ্যাত শিক্ষকের ছোঁয়ায় হয়ত আমূল পালটে গেছে কিছু মানুষের চলার পথ, নিজের জীবন দিয়েই হাজার প্রতিকূলতার মাঝেও ছাত্রদের সত্যকে আঁকড়ে চলার রসদ জুগিয়েছেন কোনও শিক্ষক। প্রতিষ্ঠান-সরকার-শাসকের চোখে তাঁরা অপ্রিয় হয়েছেন, চরম শাস্তিও পেয়েছেন হয়ত। কিন্তু তাঁদের প্রেরনা অনির্বাণ স্ফুলিঙ্গের মতো রয়ে গেছে ছাত্রছাত্রীদের হৃদয়ে, মশাল হয়ে জ্বলে ওঠার অপেক্ষায়। অথচ শিক্ষার ওপর সার্বিক আক্রমণের সামনে শিক্ষকসমাজের আজকের ছবিটা কিন্তু তেমন আশা জাগাচ্ছেনা। এ রাজ্যের বুকে একদিকে দেখছি নামী প্রতিষ্ঠানের উপাচার্য মুখ্যমন্ত্রীর হাত থেকে অনুদানের চেক নিয়ে আভূমি নত হয়ে কৃতার্থতা জ্ঞাপন করছেন এবং প্রতিটি পদক্ষেপে নিজের ও প্রতিষ্ঠানের স্বাধিকার বিক্রি করে সেই অনুদানের মূল্য চোকাচ্ছেন। একদল শাসকদলের গুডবুকে থাকার তাগিদে অতি সহজেই সম্মান-স্বাধীনতা-দায়িত্ব বিসর্জন দিচ্ছেন। যারা তা করছেন না, তারাও ঝামেলায় না গিয়ে নিরাপদ দূরত্বে থাকতে চাইছেন। বড়জোর 'কাজের পরিবেশ নেই' বা 'উপযুক্ত বেতন নেই' এমন অজুহাতে বদলি নিচ্ছেন অন্য কর্মক্ষেত্রে। শিক্ষার সমস্যা নিয়ে যাঁদের সবথেকে বেশি ভাবার কথা, সক্রিয় হওয়ার কথা, পথ দেখানোর কথা তারাই আজ বেতন আর পদোন্নতি'র দাবিটুকু বাদে সবক্ষেত্রে সুবিধাজনক নীরবতা অবলম্বন করছেন। এই বিপন্ন সময় দাঁড়িয়ে অধ্যাপক সংহতি পত্রিকার সাথে যুক্ত শিক্ষক-অধ্যাপক-শিক্ষাকর্মী'রা শিক্ষার স্বাধিকার নিয়ে ভেবেছেন, চর্চা করেছেন, কেন্দ্র ও রাজ্যের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে স্বাধিকার রক্ষার আন্দোলনে সামিল হওয়ার প্রয়োজন তুলে ধরেছেন, পাঠককে সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি পৌঁছে দিতে চেয়েছেন সংকলনটির মাধ্যমে। এখানেই বইটি ব্যতিক্রমী, প্রয়োজনীয়। ¤ (পথিকৃৎ-এর ফেব্রুয়ারি ২০১৮ সংখ্যা থেকে নেওয়া)
পথিকৃৎ
৮৮বি বিপিন বিহারী গাঙ্গুলী স্ট্রিট
কলকাতা ৭০০০১২
দূরাভাষ- 9433046280, 9433451998
ইমেইল- pathikritpatrika@gmail.com