সোমবার, ১৮ মে ২০২৬

একুশ শতকের সমাজ, মনন ও শরৎসাহিত্য

‘‘কোনো কোনো মানুষ আছে প্রত্যক্ষ পরিচয়ের চেয়ে পরোক্ষ পরিচয়েই যারা বেশি সুগম। শুনেছি শরৎ সে জাতের লোক ছিলেন না, তাঁর কাছে গেলে তাঁকে কাছেই পাওয়া যেত। তাই আমার ক্ষতি রয়ে গেল। তবু তাঁর সঙ্গে আমার দেখাশোনা কথাবার্তা হয়নি যে তা নয়, কিন্তু পরিচয় ঘটতে পারল না। শুধু দেখাশোনা নয় যদি চেনাশোনা হোত তবে ভালো হোত। সমসাময়িকতার সুযোগটা সার্থক হোত। হয়নি, কিন্তু সেই সময়টাতেই বিস্মিত আনন্দে দূরের থেকে আমি পড়ে নিয়েছি তাঁর বিন্দুর ছেলে, বিরাজ বৌ, রামের সুমতি, বড়ো দিদি। মনে হয়েছে কাছের মানুষ পাওয়া গেল। মানুষকে ভালবাসার পক্ষে এই যথেষ্ট।’’ -রবীন্দ্রনাথ আলোচকেরা বেশ বিস্মিত হলেন। দেড়শো বছর আগে জন্মানো এক গল্পকার সম্পর্কে এখনও মানুষের এহেন আগ্রহ! ইউটিউব ফেসবুকের এই ‘ওখানেই তো সব আছে’র যুগেও! গান নয় আবৃত্তি নয়, নাচ নয় নাটক নয়, ঘন্টার পর ঘন্টা নিছক সাহিত্য নিয়ে আলোচনা শোনার জন্য অডিটোরিয়াম উপচে পড়ছে! তরুণ ছেলেমেয়েরা মেঝেতে বসেও ঠায় শুনছে! এরকম সজীব পরিবেশ পেয়ে একজন আলোচক, অধ্যাপক মুস্তাক আহমেদ, আবেগবিহ´ল হয়ে পড়লেন। আলোচনা করতে করতে হঠাৎ থেমে গিয়ে বললেন, আসুন আজকের শ্রোতাদের জন্য আমরা সকলে মিলে একবার জোরে হাততালি দিই। ।। শরৎচন্দ্রের মতো মানুষেরা একেকটা মুনলাইট সোনাটা তৈরি করেন।। আলোচ্য বিষয় সম্পর্কে বক্তব্য রাখতে গিয়ে অধ্যাপক আহমেদ বললেন, এখনকার একটা বড় সংকট হল সম্পর্কের ভঙ্গুরতা। সোস্যাল মিডিয়ার জন্য যেন মনে হয় আমরা বহু মানুষের সাথে সংযোগ করতে পারছি। কিন্তু সেই সংযুক্তি কোথাও কি বন্ধুতার বাতাবরণ নিয়ে আসছে? এত মানুষের সাথে মেশবার পরেও কেন মানুষ এত একা? বলা হচ্ছে, আগামী পৃথিবীর সবচেয়ে ভয়ঙ্কর দিক হচ্ছে মানসিক অবসাদ ও একাকীত্ব। একসময় মনখারাপ হলে আমরা সাহিত্যের কাছে যেতাম, গান শুনতাম, কবিতা পড়তাম। এখনকার প্রজন্ম যাচ্ছে সায়ক্রিয়াট্রিস্টের কাছে। মনখারাপ হলেই তারা বলে আমার ডিপ্রেশন হয়েছে, কাউন্সেলার দরকার। অথচ কত বড় বড় কাউন্সেলার আমাদের রয়েছে। শরৎচন্দ্র রয়েছেন, রবীন্দ্রনাথ রয়েছেন। শরৎসাহিত্য যখন আমরা পাঠ করি তখন কিন্তু আমরা অবসাদের কারণগুলো খুঁজে পাই, অবসাদ থেকে মুক্তির পথ খুঁজে পাই। এ সময়ের আরেকটা বড় রোগ হল চরম আত্মকেন্দ্রিকতা। নিজেকে ছাড়া আর কিছুই ভাবতে পারছি না। শরৎসাহিত্য কিন্তু এ ক্ষেত্রে উপশম হতে পারে। শরৎসাহিত্য আমাদের সমাজের বহু সংশয়ের মুখোমুখি দাঁড় করায়, আমরা প্রশ্ন করতে শিখি। প্রসঙ্গক্রমে অধ্যাপক আহমেদ বলেন, নতুন জাতীয় শিক্ষানীতির প্রত্যাশা হচ্ছে একেবারে দক্ষ শ্রমিক তৈরি করা। কোম্পানিগুলো বলছে, আমরা আর কর্মীদের কোনও ট্রেনিং দেব না। স্কুল কলেজ থেকেই প্রোডাক্ট তৈরি করে দিন। আমরা শুধু জয়েন করাবো। অর্থাৎ শিক্ষার মর্মবস্তুকে সম্পূর্ণ খারিজ করা। আজ যাদবপুর, প্রেসিডেন্সি ইত্যাদির মানদণ্ড ঠিক হচ্ছে কত জন কত টাকার প্যাকেজে চাকরি পেল। কত জন মানুষ হল, কত জন মানবিক মূল্যবোধের চর্চা করছে সে সব কিন্তু ধর্তব্যের মধ্যে আসছে না। এই যে কর্পোরেট পুঁজির আগ্রাসনে বিপন্ন সমাজ, অন্যভাবে শরৎসাহিত্যে কিন্তু আমরা তার দেখা পাই। সে জন্যই আমি বলি শরৎচন্দ্র কেবল দক্ষ শিল্পী নন, তিনি এক্সপার্ট, পারদর্শী যিনি পারের ওপারটাও দেখতে পান। তাই শরৎচন্দ্র কোনও নির্দিষ্ট সময়ের লেখক নন। তিনি মানবিক সঙ্কটের লেখক। একুশ শতকের সমাজ যতই আধুনিক হোক না কেন, মানুষের সঙ্কট কাটেনি। সে জন্যই শরৎসাহিত্য কেবল অতীতের সাহিত্য নয়, বরং তা এক চলমান সংলাপ, সমাজ ও মানুষের সঙ্গে। এক সুন্দর উপমা দিয়ে অধ্যাপক আহমেদ তার বক্তব্য শেষ করেন। তিনি বলেন, বিঠোফেন তার মুনলাইট সোনাটা তৈরি করেছিলেন বন্ধুর জন্মান্ধ মেয়েকে জ্যোৎস্না কী তা বোঝাবেন বলে। আমরা যারা বহু কিছু দেখতে পাই না তাদের জন্য শরৎচন্দ্রের মতো মানুষেরা একেকটা মুনলাইট সোনাটা তৈরি করেন এবং আমরা তখন নতুন পৃথিবীর খোঁজ পাই। ‘সারা বাংলা শরৎচন্দ্র সার্ধশত জন্মবর্ষ উদযাপন কমিটি’ আয়োজিত এই আলোচনা সভায় উপস্থিত ছিলেন অধ্যাপিকা গোপা দত্তভৌমিক। তিনি শুরুতেই বলেন, শরৎবাবু ম্যাজিক জানতেন। এই শীতের বিকেলে হল উপচে মেঝেতে বসে রয়েছেন শ্রোতারা, এটা একমাত্র শরৎবাবুই পারেন। এতজন আমরা সবাই এসেছি কিন্তু তাঁর টানেই। ।। শরৎবাবুর সাহিত্য হল ধ্রুপদী সাহিত্য ।। অধ্যাপিকা দত্তভৌমিক বলেন, শরৎচন্দ্রের পুরো কেরিয়ারটাই কেটেছে এমন সময়ে যখন রবীন্দ্রনাথ খ্যাতির মধ্যগগনে। তা সত্ত্বেও তিনি জনপ্রিয়তায় রবীন্দ্রনাথকে বহু দূর ছাড়িয়ে গেছেন, এটা মোটেই সহজ ব্যাপার নয়। তাঁর ‘বড়দিদি’ যখন ঠাকুরবাড়ির পত্রিকা ভারতীতে বেরোয় তখন ভারতীর সম্পাদিকা সরলাদেবী শরৎচন্দ্রকে বলেছিলেন, আপনি নাম দেবেন না, তাহলে সকলেই ভাববে এটা রবীন্দ্রনাথের লেখা। ঠিক তাই হল। সবাই ভাবছেন রবীন্দ্রনাথ লিখছেন। তখন অন্যান্য পত্রিকার লোকজন এসে রবীন্দ্রনাথকে ধরে বলল যে, আপনি আমাদের লেখা দেন না অথচ সরলাকে দিচ্ছেন। রবীন্দ্রনাথ হতবাক। জানতে চাইলেন কী লেখা দিয়েছি? তাঁকে তখন ‘বড়দিদি’ দেওয়া হল। তিনি পড়ে বললেন, এটা আমি লিখিনি। কিন্তু খুব শক্তিশালী কোনও লেখক বাংলা সাহিত্যে এসেছেন। আলোচনার এক জায়গায় তিনি ‘পথের দাবী’ উপন্যাস সম্পর্কে বলেন, উপন্যাসটি আরও বড় হওয়ার দরকার ছিল। কারণ, এই একটিমাত্র উপন্যাস যেখানে বার্মা জাভা সুমাত্রা ইত্যাদি পূর্ব ভারতীয় দ্বীপপুঞ্জে ভারতীয়রা কিভাবে স্বাধীনতা আন্দোলনে লড়েছেন তা কোনও লেখক ধরবার চেষ্টা করেছেন। আর কোথাও নেই, কোনও লেখায় নেই। এটা একটা লুপ্ত ইতিহাস। তাই ‘পথের দাবী’ শুধুমাত্র একটা রাজনৈতিক উপন্যাস নয়। পূর্ব ভারতীয় দ্বীপপুঞ্জে যে সব বাঙালি এবং ভারতের অন্যান্য প্রদেশের বিপ্লবীরা কাজ করেছেন, এই একটি মাত্র উপন্যাসে তাঁদের ট্রিবিউট দেওয়া হয়েছে। যে কারণে এটাকে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। অধ্যাপিকা দত্তভৌমিক বলেন, শরৎচন্দ্র তাঁর বিচিত্র অভিজ্ঞতা থেকে অসাধারণ চরিত্র সৃষ্টি করেছেন যা আজ দেড়শো বছর পরেও আমাদের সমান ভাবে আকর্ষণ করে। লেখার সংযম তাঁর অসাধারণ। তাঁর লেখায় একটা শব্দও আপনি বদলাতে পারবেন না। এই জন্যই ধ্রুপদী সাহিত্য কখনো পুরনো হয় না। শরৎবাবুর সাহিত্য হল ধ্রুপদী সাহিত্য। এদিনের সভার অন্তিম আলোচক ডাঃ শুভঙ্কর চট্টোপাধ্যায় বলে, আমি ডাক্তারি পেশাগত ভাবে যখন রোগীদের দেখি তখন রোগের উৎস বোঝার জন্য তাদের অতীতগুলোকেও বোঝার চেষ্টা করি। আমার কাছে বহু তরুণ তরুণী আসেন যাদের অনেক মানসিক সমস্যা। সম্পর্কের ভাঙনের সমস্যায় তারা জর্জরিত। এগুলো তো সমাজের রোগ। প্রবীণ মানুষেরা আসেন। ছেলেমেয়েরা তাঁদের দেখে না। তাঁদের কারও কারও পয়সার অভাব নেই। কিন্তু তাঁরা একা। সভ্যতার এতগুলো ধাপ পেরিয়ে এসে এটাকে কি সমাজের উত্তরণ বলা যায়? তাহলে কিরকম সমাজ আমরা পেলাম! আপনারা জানেন, আমাদের এক সহকর্মীর মর্মান্তিক হত্যার বিচার চেয়ে আমরা সবাইকে সাথে নিয়ে দেড় বছর ধরে আন্দোলন করলাম। তার পরেও কত ওই ধরনের ঘটনা ঘটে যাচ্ছে। এমন একটা পরিস্থিতি যেখানে মানুষকে ক্রমাগত অমানুষ করে তোলার ষড়যন্ত্র চলছে। শরৎবাবু সাহিত্যে কত দিন আগে দেখিয়ে গেছেন, মানুষকে অমানুষ বানাতে না পারলে তাকে দিয়ে পশুর কাজ করানো যায় না। একুশ শতক চূড়ান্ত মূল্যবোধহীনতার সময়। কখনো কখনো আশার আলো দেখা যায়। কিন্তু সামগ্রিক ভাবে মারাত্মক হতাশা। আমাদের প্রজন্ম তাই পথ খুঁজছে। তাই যারা পথ দেখাতে পারে তাদের নিয়ে আমরা চর্চা করতে চাইছি। শরৎচন্দ্রের সাহিত্য আরও খুঁটিয়ে পড়তে চাইছি। ।। অন্ধকার রয়েছে বলেই তো আলো জ্বালার সংগ্রাম ।। ডাঃ চট্টোপাধ্যায় বলেন, আমরা সমাজের জন্য যখন কিছু করতে উদ্যোগী হই তখন অনেক হতাশা আসে। যাদের জন্য করতে যাই তারাই অনেক সময় ভুল বোঝে, বিশ্বাসঘাতকতা করে। ‘পল্লীসমাজ’ উপন্যাসে তাই একসময় গ্রামের কল্যাণচিন্তা ত্যাগ করে রমেশ শহরে ফিরে যেতে চাইছিল। সে সময় জেঠাইমা বললেন, এসেই যখন পড়েছিস বাবা, তখন অন্ধকারে একটু আলো জ্বেলে দিয়ে যা। অর্থাৎ, শুধুই গল্প নয়, একটা চরিত্র, একটা সংলাপের মধ্য দিয়ে একটা মূল্যবোধকে চারিয়ে দেওয়া হচ্ছে যে অন্ধকার আছে বলেই তো আলো জ্বালার সংগ্রাম। এ রকম বহু অসংখ্য দৃষ্টান্ত শরৎসাহিত্যে রয়েছে যার চর্চা করলে, আজকের এই সর্বগ্রাসী সঙ্কটের যুগে আমরা নতুন মানুষ হয়ে উঠতে পারি, নতুন সৌন্দর্য সৃষ্টি করতে পারি। এ জন্য স্থবির সমাজকে ভাঙতেও হয়। এই ভাঙার পথ নিয়ে বিতর্ক আছে। অহিংস সহিংস নিয়ে বিতর্ক আছে, বিভ্রান্তি আছে। বহু শিক্ষিত মানুষের মধ্যেও আছে। তাই ‘পথের দাবী’তে শরৎচন্দ্র দেখালেন যে, সব্যসাচী এবং ব্রজেন্দ্র দুজনেই সশস্ত্র সংগ্রামের পথে রয়েছে। কিন্তু সব্যসাচীর পথ আর ব্রজেন্দ্রর পথ এক নয়, বরং সম্পূর্ণ বিপরীত। তাদের মূল্যবোধ বিপরীত। ‘পথের দাবী’ না পড়লে এই বিপরীত মূল্যবোধের সন্ধান পাওয়া যাবে না। আবার, শুধু ‘পথের দাবী’তেই আটকে থাকলে আজ চলবে না। কারণ, পথের যেমন দাবি আছে, সময়েরও তেমন দাবি আছে। সমাজ বিপ্লবের পথ যুগোপযুগী না হলে, হাজার চেষ্টা করলেও, তা সফলতা পাবে না। ।। শরৎচন্দ্র এসে বয়ানটা উল্টে দিলেন ।। এদিনের আলোচনায় সভাপতি ছিলেন সাহিত্যিক রামকুমার মুখোপাধ্যায়। তিনি বলেন, রামমোহন-বিদ্যাসাগরের পর আমরা আর কোনও তেমন সমাজ-সংস্কারক পাইনি। তবু যদি কোনও নাম এ ক্ষেত্রে করতে হয় তাহলে নিঃসন্দেহে তিনি শরৎচন্দ্র। কারণ, বহু সমাজতাত্ত্বিক এসেছেন কিন্তু শরৎচন্দ্র যে ভাবে আমাদের সমাজ বুঝিয়েছেন তা আমাদের বিরাট অবলম্বন। আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার খেয়াল করে দেখবেন, শরৎচন্দ্রের আগে সারা দেশের উপন্যাসেই সংসার ভাঙার কারণ হচ্ছে নারী। শরৎচন্দ্র এসে বয়ানটা উল্টে দিলেন। তাঁর উপন্যাস বা প্রবন্ধ পড়লে দেখা যায় সংসার ভাঙার কারণ নারী নয়, বরং পুরুষতান্ত্রিক সমাজ। এত বড় জিনিসটা শরৎচন্দ্র করে দেখালেন। তাই দেখবেন শরৎচন্দ্রের পরে যেসব ঔপন্যাসিক এলেন, তারাশঙ্কর, বিভুতিভূষণ, মানিক প্রমুখ এরা কিন্তু শরৎচন্দ্রের ধারাটাই অনুসরণ করেছেন। বঙ্কিম-রবীন্দ্রনাথের ধারা খুব কেউ একটা অনুসরণ করেনি। শেষে তিনি আরও একবার উপস্থিত শ্রোতাদের ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন যে, আমরা এই কর্মসূচির প্রচার মোটেই করতে পারিনি। তবু এত মানুষ এসেছেন, তরুণ বন্ধুরা এসেছেন এবং সকলেই এমন তন্ময় হয়ে শুনছেন তার সমস্ত কৃতিত্ব শরৎচন্দ্রেরই। (সূত্র : পথিকৃৎ, জানুয়ারি ২০২৬)

পথিকৃৎ

আমাদের পত্রিকা ওয়েবসাইটের সাথে যুক্ত থাকুন এবং সর্বশেষ খবর ও গুরুত্বপূর্ণ আপডেট নিয়মিত পান

যোগাযোগ

পথিকৃৎ
৮৮বি বিপিন বিহারী গাঙ্গুলী স্ট্রিট
কলকাতা ৭০০০১২

দূরাভাষ- 9433046280, 9433451998
ইমেইল- pathikritpatrika@gmail.com

গুরুত্বপূর্ণ লিংকসমূহ

© Pathikrit. All Rights Reserved. Designed By GenxByte